ভালোবাসা দিবসে স্বামীকে চমকে দেওয়ার জন্য আমি অফিসে ফুল আর কাশ্মীর যাওয়ার বিমানের টিকিট নিয়ে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, তা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হয়ে দাঁড়াল। পুরো অফিসজুড়ে আনন্দ-উৎসব চলছে। সবাই আমার স্বামী ইয়াসিনের বাগদানের আনন্দে মেতে উঠেছে। আর সেই বাগদান হয়েছে কোম্পানির নতুন নারী প্রধান তানিয়ার সঙ্গে।
আমার চোখের সামনে ইয়াসিন তানিয়াকে চুমু খেল। তারপর তানিয়ার হাতে একটি হীরের আংটি পরিয়ে দিল। চারপাশের সবাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল।
আমি শুধু ঘুরে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে চলে এলাম।
সঙ্গে সঙ্গে কাশ্মীর ভ্রমণ বাতিল করলাম। আমাদের যৌথ সব ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বন্ধ করে দিলাম। এরপর কোম্পানিতে থাকা আমার ৮৩ শতাংশ মালিকানার শেয়ারও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিলাম।
সেই শেয়ারের বর্তমান মূল্য ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা।
এর মাত্র ত্রিশ মিনিট পর আমার ফোনের পর্দায় ভেসে উঠল— ১৫২টি মিসড কল।
তারপর আমার বাড়ির দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
দরজা খোলার আগে পর্যন্ত আমি জানতাম না, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আমার জীবনকে আরও কতটা বদলে দিতে চলেছে।
আমার চোখে প্রথম যে দৃশ্যটি ধরা পড়েছিল, তা হলো—রুপালি রঙের একটি ব্যানারের নিচে আমার স্বামী ইয়াসিন অন্য এক নারীকে চুমু খাচ্ছে। ব্যানারে বড় করে লেখা ছিল— “বাগদানের শুভেচ্ছা।”
দ্বিতীয় যে দৃশ্যটি দেখলাম, তা হলো—প্রায় দুইশো কর্মচারী ইয়াসিনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আনন্দে হাততালি দিচ্ছে।
কেউ যেন আমাকে দেখেও দেখছে না। মনে হচ্ছিল, আমি যেন তার জীবনে কখনো ছিলামই না।
আমি কাচের দরজার ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এক হাতে ছিল বারোটি লাল গোলাপ, আর অন্য হাতে ছিল কাশ্মীর যাওয়ার দুটি বিমানের টিকিট।
ভালোবাসা দিবস। আমাদের বিয়ের দশ বছর পূর্তি।
আমি কত যত্ন করে পুরো আয়োজনটা করেছিলাম!
কয়েক সপ্তাহ ধরে ইয়াসিন প্রতিদিনই দেরি করে বাড়ি ফিরছিল। সে আমাকে বলেছিল, কোম্পানির নতুন প্রধান তানিয়া নাকি প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছেন, তাই কাজের চাপ অনেক বেড়ে গেছে।
আমি তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। কারণ আমাদের দশ বছরের দাম্পত্য জীবনে আমি বারবার সেই ইয়াসিনকেই বিশ্বাস করেছি, যে মানুষটি বাড়িতে আমার সামনে নিজেকে একজন আদর্শ স্বামী হিসেবে তুলে ধরত। কিন্তু সেদিন তানিয়া যখন নিজের বাঁ হাতটা সবার সামনে তুলে ধরল, আমার চোখ আটকে গেল তার আঙুলের দিকে।
তার আঙুলে থাকা বিশাল হীরের আংটিটি ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমল করছিল।
ইয়াসিন হাতে থাকা পানীয়ের গ্লাসটি উঁচু করে বলল,
“নতুন জীবনের শুরু হোক।”
সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঘর আনন্দধ্বনি আর হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একজন কর্মচারী হঠাৎ আমাকে দেখতে পেল। মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। ইয়াসিনও তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দরজার দিকে তাকাল। আমাকে দেখামাত্র তার মুখের সমস্ত আনন্দ যেন এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেল।
তারপর তানিয়া ঘুরে আমার দিকে তাকাল।
আমাকে দেখে সে বরং হেসে উঠল।
“ওহ! তুমি এসেছ?”
আমি ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম,
“তোমার বাগদান হয়ে গেছে?”
ইয়াসিন আমার দিকে এগিয়ে এল। তারপর নিচু গলায় বলল,
“সুরাইয়া, এখানে এসব নিয়ে কথা বলো না।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললাম,
“বাহ! কথাটা বলার জন্য জায়গাটাও বেশ ভালোই বেছে নিয়েছ।”
তানিয়া দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে বলল,
“ইয়াসিন আমাকে বলেছে, তোমাদের বিয়েটা আসলে অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“শেষ হয়ে গেছে?” ইয়াসিনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
সে বলল, “আমরা আজ রাতে এসব নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম।” আমি তার আঙুলের আংটির দিকে তাকালাম। তারপর নিজের হাতে থাকা বিমানের টিকিট দুটির দিকে তাকিয়ে বললাম,
“কাশ্মীর যাওয়ার আগে, নাকি ফিরে আসার পরে?”
আমার কথা শুনে ইয়াসিনের চোখ সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতে থাকা টিকিটের দিকে চলে গেল।
পুরো ঘর মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তানিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বলল,
“বেশ লজ্জার ব্যাপার।”
আমি একবার তার দিকে তাকালাম।
তারপর তাকালাম ইয়াসিনের দিকে।
সেই মুহূর্তে আমার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গেল।
কাচের মতো নয়।
বরং মনে হলো, এতদিন ধরে বন্ধ থাকা কোনো দরজা হঠাৎ খুলে গেছে।
আমি হাতে থাকা গোলাপগুলো অভ্যর্থনা ডেস্কের ওপর রেখে দিলাম। শান্ত গলায় বললাম, “অভিনন্দন।”
ইয়াসিন বিস্মিত হয়ে বলল, “সুরাইয়া, দাঁড়াও!”
আমি আর পেছনে ফিরে তাকালাম না।
সোজা হেঁটে অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম।
লিফটে ওঠার পর বুঝতে পারলাম, আমার হাতের কাঁপুনি থেমে গেছে।
পার্কিংয়ে পৌঁছানোর আগেই আমি কাশ্মীরের পুরো ভ্রমণ বাতিল করে দিলাম।
গাড়িতে ওঠার পর আমাদের যৌথ সব ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বন্ধ করে দিলাম—যেসব হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রে আমার অনুমোদন প্রয়োজন ছিল।
বাড়িতে পৌঁছানোর পর আমি আমার আইনজীবী ফারজানা রহমানকে ফোন করলাম।
সে দ্বিতীয়বার ফোন বাজতেই কল ধরল।
“কী হয়েছে, সুরাইয়া?”
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললাম,
“দাম্পত্য সুরক্ষা চুক্তিটা কার্যকর করতে হবে।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল।
তারপর ফারজানা বলল, “তুমি কি নিশ্চিত?”
আমি দৃঢ় গলায় বললাম, “হ্যাঁ। আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত।”
ইয়াসিন বছরের পর বছর সবাইকে বলে বেড়িয়েছে, সে নাকি নিজের যোগ্যতায় শূন্য থেকে এই বিশাল কোম্পানি গড়ে তুলেছে।
এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় মিথ্যা।
সত্যিটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আমার প্রয়াত বাবা, আবদুল হাকিম সাহেব।
বাবা মারা যাওয়ার পর কোম্পানির ৮৩ শতাংশ মালিকানা আমার কাছে চলে আসে।
ইয়াসিন জানত আমি কোম্পানির একজন বড় শেয়ারহোল্ডার। কিন্তু সে কখনো জানার প্রয়োজনই মনে করেনি, বাবা কীভাবে সেই শেয়ারগুলো আমার ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত করে রেখে গিয়েছিলেন।
সে এটাও জানত না, ওই ৮৩ শতাংশ মালিকানার সঙ্গে কতটা ক্ষমতা জড়িয়ে আছে।
ইয়াসিন ভেবেছিল, বাবাকে হারানোর পরের শোক আমাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
সে আমার নীরবতাকে অজ্ঞতা ভেবেছিল।
কিন্তু নিজের রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সেদিন আমি বুঝতে পারলাম—আমার নীরবতার মূল্য সে এবার নিজের সবকিছু দিয়ে পরিশোধ করবে।
আর তখনও ইয়াসিন জানত না, মাত্র ত্রিশ মিনিটের মধ্যে তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে।