স্বামীর অবহেলা

আমার স্বামী আমাকে “বোঝা” বলে অপমান করে আমাদের মাত্র ১২ দিনের মেয়েকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। কারণ, সে তার ব্যক্তিগত সহকারী তানিয়ার জন্য আমাকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিল।

তিন বছর পর, তার ধ্বংসের মুখে থাকা ব্যবসা সাম্রাজ্য বাঁচাতে সে আমার কোম্পানির কাছে ৫০ লাখ টাকা সাহায্য চাইতে এসেছিল।

কিন্তু বৈঠকের টেবিলের ওপাশে আমাকে দেখে সে হঠাৎ জমে গেল।

তবে আসল চমক তখনও বাকি ছিল।

সে চলে যাওয়ার কয়েক মিনিট পর আমার আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফারজানা রহমান পুরোনো প্রতিষ্ঠাতা দলিলগুলো খুললেন। তারপর সেখানে থাকা আমার নামের দিকে আঙুল রেখে বললেন,

“রাইসা… আমার মনে হচ্ছে, এই কোম্পানির মালিকানা কখনোই পুরোপুরি তোমার হাতছাড়া হয়নি।”

যেদিন সকালে আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছিল

আমার মেয়ের জন্মের বারো দিন পরের কথা।

আমি তখনও ধীরে ধীরে চলাফেরা করছিলাম। সন্তান জন্মের পর শরীর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। আমাদের নিজেদের বাড়িতে বসে বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি নতুন মা হিসেবে আমার ছোট্ট মেয়েকে কীভাবে সামলাতে হয়, সেটাও শিখছিলাম।

সেদিন সকালে আমার স্বামী ইয়াসিন হাতে একটি ধূসর রঙের ফাইল নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকল।

সে ফাইলটি আমার পাশে বিছানার ওপর রেখে বলল,

“এগুলোতে তোমাকে সই করতে হবে।”

আমি ফাইলটি খুলে প্রথম পাতার দিকে তাকালাম।

বিবাহবিচ্ছেদের কাগজপত্র। কয়েক সেকেন্ড আমি শুধু কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইলাম।

সত্যি বলতে, আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে আমি ঠিকভাবে পড়েছি।

আমি কাঁপা গলায় বললাম,

“ইয়াসিন, আমাদের মেয়ের বয়স মাত্র বারো দিন!”

সে ঘরের একপাশে রাখা দোলনার দিকে প্রায় তাকালই না। সেখানে আমার ছোট্ট মেয়ে লায়লা ঘুমিয়ে ছিল।

“আমি জানি।” “তাহলে এগুলো কী?”

ইয়াসিন বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—“এমন একটা কাজ, যেটা আমার কয়েক মাস আগেই করা উচিত ছিল।”

আমি কিছু বলার আগেই বাইরে থেকে পায়ের শব্দ ভেসে এলো।

একজন নারী দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।

তানিয়া।

ইয়াসিনের ব্যক্তিগত সহকারী।

তার পরনে ছিল ঢিলেঢালা সাদা একটি পোশাক।

আমি সঙ্গে সঙ্গে পোশাকটি চিনতে পারলাম। কারণ গত বছর ঈদের সময় আমি নিজেই সেটি তানিয়াকে উপহার দিয়েছিলাম।

তানিয়া সোজা ইয়াসিনের কাছে গিয়ে তার বাহুর ওপর হাত রাখল।

তারপর বলল,

—“তুমি বলেছিলে, বাচ্চা জন্মানোর আগেই সবকিছু মিটে যাবে।”

ইয়াসিন নিচু স্বরে উত্তর দিল,

—“আমি জানি। প্রত্যাশার চেয়ে একটু বেশি সময় লেগে গেল।”

আমি একবার ইয়াসিনের দিকে, একবার তানিয়ার দিকে তাকালাম।

হঠাৎ করে গত কয়েক মাসের প্রতিটি ঘটনা আমার মাথার ভেতর নতুন করে সাজতে শুরু করল।

দেরি করে বাড়ি ফেরা…

অকারণে বাইরে কাজে যাওয়ার অজুহাত…

আমার সঙ্গে রাতের খাবারের পরিকল্পনা বাতিল করা…

ছুটির দিনেও হঠাৎ জরুরি কাজের কথা বলে বেরিয়ে যাওয়া…

সবকিছু যেন এক মুহূর্তে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে গেল।

আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

—“কতদিন ধরে?”

ইয়াসিন এমন ভান করল না যে সে আমার প্রশ্ন বুঝতে পারেনি।

সে সরাসরি বলল,

—“প্রায় এগারো মাস।”

আমার মনে হলো, মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরটা যেন আমার চারপাশে কাত হয়ে গেছে।

প্রায় এক বছর ধরে আমার স্বামী আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে আসছিল।

আর আমি তখন তার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর পর নিজের শরীর ও মন সামলাতে ব্যস্ত ছিলাম।

মাত্র বারো দিনের লায়লাকে বুকে নিয়ে আমি তখনও মাতৃত্বের নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম।

অথচ ইয়াসিন এরই মধ্যে আমাদের সংসার ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল।

তার চোখে আমি আর তার স্ত্রী ছিলাম না।

আমি হয়ে গিয়েছিলাম তার কাছে একটি “বোঝা”।

কিন্তু ইয়াসিন তখনও জানত না, যাকে সে বোঝা ভেবে আজ ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে, সেই রাইসাই একদিন তার সামনে এমন অবস্থানে দাঁড়াবে, যেখানে তাকে সাহায্যের জন্য আমার কাছেই আসতে হবে।

আর তিন বছর পর সেই দিন সত্যিই আসবে।

যে মানুষটি আমাকে আর আমার বারো দিনের শিশুকে অসহায় অবস্থায় বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, সেই ইয়াসিনই একদিন আমার সামনে বসে তার ডুবতে থাকা ব্যবসা বাঁচানোর জন্য ৫০ লাখ টাকা চাইবে।

কিন্তু সেদিন সে জানত না—তার সামনে বসে থাকা রাইসার হাতে শুধু টাকা নয়, তার নিজের ভবিষ্যতের চাবিটাও ছিল।

Leave a Comment